বিশ্বাসের শাদা মেঘে ভর করে উড়ুক সন্দেহ-রোগে আক্রান্ত মন

0
82

বিশ্বাসের শাদা মেঘে ভর করে উড়ুক সন্দেহ-রোগে আক্রান্ত মন
কামাল হোসেন রাতুল

নানা মাত্রিক সম্পর্কের আবর্তে মানুষের জীবন বয়ে চলে। এ বয়ে চলা জীবনে সম্পর্কের ভিত্তি হচ্ছে বিশ্বাস।বিশ্বাস ওঠে গেলে সম্পর্কে ভাঙ্গন লাগে।সম্পর্ক ভেঙ্গেও যায়।তিক্ততা নিয়ে অভ্যস্ত পথ হাঁটা যায় বটে,তবে তা কতদূর? খুব বেশি না। পড়ে থাকে ছাপ, সময়ের খোলস অর্থাৎ স্মৃতি। মানুষ পরিবর্তন চায়।একটু স্বস্তি চায়।সব জায়গায় মানুষ একটু শান্তি খুঁজে ফিরে।চায় এক বা একাধিক নির্ভরতার জায়গা। এটা সংসারে হোক,অফিসে হোক।ব্যবসায় হোক, সর্বত্র।কেউ কেউ মনে করেন সম্পর্কে সন্দেহ থাকা ভালো। সন্দেহের কল্যাণে জংধরা সম্পর্কে নতুন মাত্রা সূচিত হয়।আসলে তা একেবারে ভুল।যারা মনে করেন সন্দেহ থাকা ভালো তারা কয়েকটা ঘটনা স্টাডি করলেই তা ভুল হিসেবে প্রমাণিত হয়ে যাবে নিমিষে। একবার যদি সন্দেহ নামের কাক মাথার উপর বসে কাজের কাজ সেরে দিতে পারে শরীর মন দুটোই অপবিত্র হয়ে যায়।তিক্ত -বিরক্ত, উদ্বিগ্ন, নিরাপত্তাহীন বোধে কাঁপতে থাকা মনের অবস্থায় আপন মানুষের কথায়, কাজে একটু হেরফের পেলেই সন্দেহের কাক এসে কা কা কা…! রব করে অস্থির করে তোলে।অস্থির মনে আপনি অনেক ভুল করে বসতে পারেন। তাই আপনাকে আগে কাকটাকে বশে আনতে হবে। সে মনের দেয়ালে বসে থাকলে বসে থাকবে। তবে চুপচাপ।বশে এলে দেখতে হবে আপনার সন্দেহে থাকা মানুষটা কি, কোন গতিপথ দাবি করছে । কারো প্রভাবে? না কারো প্ররোচনায় স্রোতের বিপরীতে হাঁটছে তা দেখতে হবে। মন দিয়ে দেখতে হবে।যাতে কোনো ভুল হয়ে যাবার সুযোগ না থাকে।যদি আপনার সন্দেহ ঠিক হয়ে থাকে তবে আপনার উচিত তার সাথে রাগরাগি না করে কৌশলে আলোচনা করা। খুব বেশি সময় দিয়ে মেশা। এর কারণে হয়তো আপনার আপন মানুষটি ব্যাকরণ মেনে জীবন চালাতে মনের জোড় পাবেন,উৎসাহ পাবেন।
ব্যাংকের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা (ছদ্মনাম) এজাজ মুন্না অতিরিক্ত সন্দেহপ্রবণ মানুষ। এ সন্দেহ প্রবণতার কারণে তিনি কখনো ঘরে-বাইরে, অফিসে কোথাও সুখে থাকতে পারেন না। অফিসে নিজের ডেস্কে বসে যদি দেখেন -বসের চেম্বারে বসের সাথে তাঁর নিম্নপদস্থ একজন দীর্ঘ আলাপে মশগুল।
তখনি তার ভেতরে খিটির-মিটির আরাম্ভ হয়ে যায়। জানা চাই এদের মধ্যে ঠিক কী বিষয়ে আলাপ হলো। না জানা অব্ধি তার সুখ নেই।ঐ নিম্নপদস্থ লোকের পিছে লেগে থাকেন।নানা ভাবে চেষ্টা চালিয়ে যান। বোকামি মার্কা চেষ্টার পর, ঐ সেয়ানা লোক তাঁর প্রবলেমটা ধরতে পারেন। তাতে আরেকটু ঘি ছড়িয়ে দিয়ে তিনি মজা লুুটতেই বলেন- স্যার, আপনার কথাই বলছিলাম স্যারকে। আপনি যে ভালো কাজ পারেন…!ব্যস হয়ে গেল। তিনি ধরে নিলেন ঐ লোক তাঁর নামে কুমন্ত্রণা দিয়ে এসেছেন।কারণ তিনি জানেন নিজে কতোটা এ কথাটার যোগ্য। দুর্বলতা ঢাকার চেষ্টা সবসময় তাঁর মনে বহমান থাকে।এ জ্বালা না মেটা পর্যন্ত তিনি নানা ঐ লোকটাকে অপদস্থ করার পাঁয়তারা করেই যাবেন। এমনটা করতে গিয়ে নিজেও সে ফাঁদে পড়ে যাবেন।
ঘরের কথা বলি- গেল বছর তাঁর মেয়ে এস এস সি দিচ্ছিল, মেয়ে বায়না ধরল- ”পরিক্ষিার পর তাকে অনেক দামি একটা মোবাইল কিনে দিতে হবে।” মেয়ে মোবাইল চাইছে কেন? শুরু হয়ে গেল কিটির-মিটির। সাথে সাথে তিনি কথা দেন না, ভাবেন।মেয়ের মুখ দেখেন। দেখলেন মেয়ের মুখ অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে গেছে তখন তাকে কথা দিতে হয়,কারণ মেয়ে যদি অভিমান করে রেজাল্ট খারাপ করে ?না না তিনি তা হতে দিতে পারেন না।

মেয়ের ভবিষ্যত বলে কথা।তা-ই তিনি মেয়েকে মোবাইল কিনে দিতে রাজি হন।সময় মতো মেয়ে পরিক্ষা দেয়। ভালো পাশও করে।পাশ করার পর মেয়ে চেয়ে থাকে তার বাবা কখন তার দাবি পূরণ করছে। কিন্তু না,দিনের পর দিন চলে যাচ্ছে। তার বাবা তার দাবি পূরণ করছে না দেখে। সে বাবাকে মুখফোটে আবারো বলে।শুনার পর তিনি যা বললেন তা শুনে সে তো অবাক।অন্তত বাবার মুখে নিজের মেয়ে সম্পর্কে এমন সন্দেহযুক্ত মন্তব্য সে আশা করেনি-মেয়ে বড় হলে তাঁর সব আবদার পূরণ করা চলেনা। দামি মোবাইল একটা শয়তানের ফাঁদ। শয়তানের ফাঁদে পড়ে
তাঁর মেয়ে বাবার মুখে চুনকালি মাখাবে তা উনি চাইবেন কেন? স্কুলে নিজের টিচার মায়ের ছায়ায় ছিল সে।কোনো চিন্তা ছিলো না।এখন কলেজে যাবে ওখানে তো তার মাকে প্রফেসর করে পাঠাতে পারবেনা মেয়েকে আগলে রাখার জন্যে। তিনি মরছেন সে টেনশানে।তার ওপর মোবাইল নামের শয়তান হাতেচাপিয়ে দেয়ার কোনো মানে হয়। এদিকে মেয়ে তো প্রচন্ড জেদি। তা আদায় না করে ছাড়বে না।নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে দেয়ার মতো মোক্ষম অস্ত্র ব্যবহার করে সে সফল হয়। নিরুপায় হয়ে কিনেই দেন।শুধু মেয়ের জন্যে কিনে দেন তা নয় নিজের জন্যেও কেনেন। মেয়ের উপর নজরধারি করার জন্যে।নজরধারি করে তিনি কিছুই পান না। পাওয়া যায় ও না।তবু তিনি ফেসবুকে হাতড়ান- মেয়ের ফ্রেন্ডলিস্ট।তার ছবিতে কে কি কমেন্ট করছে এসব। এখন উনার মনে হয় মেয়েটা বরবাদ হয়ে যাচ্ছে।সাথে নিজের বউটাও।তার ছবিতেও আজকাল পিচ্ছি পিচ্ছি পোলাপান যা খুশি মন্তব্য করে যাচ্ছে।এসব ফালতু কমেন্টের বিনিময়ে ধন্যবাদ ও পাচ্ছে। একদিন মেয়ের মা কারো ফোন পেয়ে হুট করে বেরিয়ে যাচ্ছে দেখে। তার পিছু নেন। পিছু নিয়ে দেখেন রাস্তায় মোড়ে একটা ছেলে দাঁড়িয়ে আছে ফুলের তোড়া হাতে। যা বুঝার বুঝা শেষ। বাসায় ফিরলে বিশ্বাসযোগ্য কোনো উত্তর খুঁজে পান না তিনি। কাজেই মনের ভিতর কিটির-মিটির শুরু।
মা মেয়েকে নিয়ে সবসময় একটা আতঙ্ক কাজ করে ভেতরে ভেতরে এটা তিনি কাউকে দেখাতে পারেন না। তাই তিনি প্রায় অকারণে রেগে যান বাসায়, অফিসে সর্বত্র।

এই “এজাজ মুন্না” চরিত্রের আগাগোড়া সন্দেহময়।এমন মানুষেরা সমাজে, পরিবারে কর্মস্থলে সর্বত্র একা হয়ে পড়েন। কারো সাথে সখ্যতা গড়ে ওঠেনা।সম্পর্কে আঁটসাট বাঁধন নেই।তাঁর কাছে সবদিক কেমন ছন্নছাড়া মনে হয়। সবাই-ই তিনি না থাকলেেই স্বস্তি পান। তার কারণটা সহজে অনুমান করতে পারি আমরা কারণ তিনি বিশ্বাসকে মনের গভীরে স্থাপন করতে পারেন নি জীবনে।যার ফলে তিনি সন্দেহের কবলে পড়ে যান সহজেই।সন্দেহ বৃদ্ধি বা কমানোর নিয়ন্ত্রণ থাকে তখনি যখন বিশ্বাসের শক্তি প্রবল হয়।সমাজের অসৎ লোকেরা তার ঘর পোড়লে সবাইকে সন্দেহ করতে থাকে কারণ সে সবাইকে নিজের মতো মনে করে।বর্ণিত চরিত্রকেও অসৎ বলা যায়, না হলে তিনি এমনটা করবেন কেন? কে বলতে পারে তাঁর মনের ঘরের দ্বিতীয় দরোজা অন্যকারো জন্যে খোলা আছে কিনা। কে বলতে পারে।হলফ করে বলা যায় না। এই দ্বিতীয় দরোজার সন্ধান জানতে চাওয়ার ইচ্ছেটা তখনি জাগবে যখন আপনার মনে সন্দেহ আসবে। সন্দেহ এলে আসবে, আপনি বিশ্বাসের শাদা মেঘে ভর করে উড়বেন।বিশ্বাসের শাদা মেঘে ভর করে উড়লে।লোক হাসাহাসি হবেনা।।সম্পর্ক মচকাবে না।ভাঙ্গলে ভাঙ্গবে

উত্তর দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here