স্বপ্ন কামাল হোসেন রাতুল

0
53

স্বপ্ন
কামাল হোসেন রাতুল

“হাবিব,কাল মাঝরাতে অদ্ভুত একটা স্বপ্ন দেখেছে।স্বপ্নে সে দেখেছে- তার বউ সোহাগার কোল আলো করে ফুটফুটে, ছবির মতো সুন্দর একটা বাচ্চা এসেছে। উঠোনে মাদুর বিছিয়ে বাচ্চাটাকে নিয়ে সোহাগা খেলছে আর কত আদর করছে ! অদূরে থেকে দৃশ্যটা দেখে হাবিব তো ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়।অবিকল তার মুখের আদলে এমন সুন্দর শিশু, কোত্থেকে এলো ওর কোলে? এটা কার বাচ্চা? এমন প্রশ্ন সে মনে মনে করছিল। সোহাগার কোলে সে বাস্তবে অনেক শিশু দেখেছে। ও শিশুদের খুব ভালোবাসে, কারো বাচ্চা পেলেই ও কোলে নেয়, আদর করে এটা-ওটা খাওয়ায়। স্বপ্নেও তাই হবার কথা, হচ্ছিলও তাই। কিন্তু না- ব্যাপারটা অন্যরকম ঠেকছিল তার কাছে।অন্যরকম অনুভূতি জেগেছে তার মনে।ভ্যাবাচ্যাকা অবস্থা কেটে গেলে ও নিজেকে স্থির রাখতে পারেনা।বাচ্চাটাকে কোলো নিতে, একটু আদর করতে তার মন দারুণ আগ্রহী হয়ে ওঠেছিল। ধীর পায়ে সামনে গিয়ে বাচ্চাটাকে কোলে নিতে গেলেই বাঁধে বিপত্তি।একটা পর মানুষ তাঁর বাচ্চাকে কোলে নেয়ার আবদার করছে দেখেই যেন সোহাগা ভয় পেয়ে গিয়েছিল।বাচ্চাটাকে দ্রুত কোলে তোলে নিয়ে ঘরে চলে যায়।বাচ্চাটা আড়াল করে ও দরোজা আগলে দাঁড়ায়।ভয়ার্ত মুখে বলে-না কিছুতেই ও বাচ্চাটার কাছে যেতে দেবে না, ওটা শুধু তার। বাচ্চাটাকে ও আল্লাহর কাছে চেয়েই পেয়েছে। অনেক সেধেও কাজ হচ্ছেনা দেখে, জোড় জবরদস্তি করে।এতেও ও কাজ হয় না। না ও কিছুতেই বাচ্চাটার নাগাল পায় না।একটিবার ও ছুঁয়ে দেখতে পারে না” ছুঁয়ে দেখতে না পারার যন্ত্রণা নিয়ে ওর ঘুমটা ভেঙ্গেছে।ঘুম ভাঙ্গলে ও কিছুক্ষণ বিছানায় চুপচাপ বসে থাকে। কি ভেবে বিছানা ছেড়ে ও অন্ধকাচ্ছন্ন ঘরটা থেকে চুপিচুপি বের হয়। শব্দ হলে ঝামেলা বাঁধবে। এ একই রুমে আরো তিনটি মানুষের থাকে।তাঁদের ঘুম ভাঙ্গবে।এই দূর পরবাসী শ্রমিক মানুষের রাতের ঘুমটা খুব মূল্যবান।রাতে ভালো ঘুম না হলে দিনে কঠোর পরিশ্রম করাটা দুঃসাধ্য হয়ে ওঠে। হাবিবরা যে যায়গাটাতে থাকে তার পাশে চমৎকার একটা মসজিদ আছে।ও মসজিদে গিয়ে ও তাহাজ্জুদ নামায পড়ে বারো রাকাত। এর পরেই ও স্বপ্নটা নিয়ে ভাবতে বসে। ভাবে কদিন আগে পাওয়া কাজটা হাত ছাড়া হয়ে যাচ্ছে কিনা। না-না তা হবে না। ওর দক্ষতার ব্যাপারে ও সজাগ।নিজের ভুলটা ওর নজরে সবার আগেই পড়ে।দেশ থেকে এই মরুর বুকে আসার আগে সোহাগার পেটে একটা বাচ্চা দিয়ে আসলে বেশ হতো। তাঁর বয়সটা কম দেখে, মায়ের কড়া আদেশ উপেক্ষা করেছে ও।তা ছাড়া আরো একটি কারণ ছিল। তবে সোহাগা চেয়েছে মা হতে।খুব করে চেয়েছে প্রতিরোধক এড়িয়ে চলতে। আমানের কড়া নজরদারিতে তা সম্ভব হয় নি।আজ ভাবছে ভুল করে আসেনি তো।নইলে ও এমন স্বপ্ন দেখবে কেন?কেন সে কাল এমন স্বপ্ন দেখল সে চিন্তা মাথা থেকে তাড়াতেই পারছে না।
সে চিন্তা নিয়েই কাজ করছে আজ।হাত কাজ করছে, মাথায় ঘুরছে চিন্তা।হঠাৎ ওর ফোন বেজে ওঠে।বাজতে বাজতেই থামে।আবারো বাজে। বেজেই চলেছে।কাজে বা ফ্রি থাকলে ও খুব বেশি কথা বলে না। ফোনেও না।পরপর বাজছে দেখেই ও ফোন তুলে দেখে তাঁর মা কল করছে। ভাবে এখন কাজের সময় মা কল করছে কেন? ওরা তো জানে সে কখন ব্যস্ত থাকে।

হ্যালো –
অপর প্রান্তে তার মায়ের উচ্ছ্বসিত কণ্ঠ বেজে ওঠে।মায়ের উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে তার মধ্যে বিরক্তির উদ্রেক হয়।ওর মনে হয় মা কোনো গুরুত্বপূর্ণ কারণে এখন ফোন করেনি।কাজের সময় অযথা সময় নষ্ট করা তার পছন্দ না । তার হাতে মেলা কাজ। একটা পুরাতন ফ্ল্যাটকে নতুন করে ইন্টারিয়ার ডেকোরেট করার কাজ নিয়েছে সে। দশ-বারো জন লোক তার আন্ডারে কাজ করছে।সবদিক খুব ভালো মতন খেয়াল রাখতে হচ্ছে সবসময় । তদারকি করতে হয় মন দিয়ে। ডিজাইনের হেরফের হয়ে গেলে তো তারই লস।ওপাশ থেকে কোনো স্পষ্ট কোনো কথা আসছে না,হ্যালো- করেই শেষ।দুই একজনের চাপা হাসির শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। ওর বিরক্তি আরো বাড়ে।
‘হ্যালো -আম্মা কী বলবা তাড়াতাড়ি বল ! খুব ঝামেলায় আছি!’
‘হুন বাপ জানি তুই এই সময় ঝামেলায় থাকস।তবু তরে কল দিসি একখান বিরাট খবর দেওনের জন্যি !
হাবীব জানে এটা মোটেও কোনো বড় খবর না।সব মেয়ে মানুষই তুচ্ছ ঘটনাকে বড় করে প্রচার করে।
‘কী বিরাট খবর আম্মা?’
‘তুই বাপ হইছস রে বাপ! আমি দাদি ! দুনিয়ায় আমার সোনার চাঁন নাতি আসছে কিছুক্ষণ আগে ! ‘
মা এটা কী বলল! ঠিক শুনেছে তো? নিজের কানকে সে বিশ্বাসই করতে পারছে না।তাই সে আবার জানতে চায় -‘কী বললেন আম্মা?’
‘আরে গাধা তোর একটা ছেইলে হইছে ! ‘
কথাটা শুনামাত্র ও স্তব্ধ হয়ে যায়।মুখ দিয়ে আর কোনো কথা ফুটেনা।বলা নেই কওয়া নেই হঠাৎ করে সে একটা বাচ্চা ছেলের বাবা হয়ে গেল! ‘কাক’ তাঁর সবচে অপছন্দের
পাখি সে একদম সহ্য করতে পারেনা। এ অসহ্য এক সন্দেহেরর কাক তার মনের দেয়ালে বসে কা কা কা… রব করে চলেছে হঠাৎ। না না তা হবে কেন। সে ওটা তাড়ায়।তাড়ালে কি যায়? যায় না আবার ফিরে আসে।এটা কি করে সম্ভব? মা তো হ্যালো -হ্যালো করে অস্থির! ও ফোন রেখে দেয়।তা হলে- সন্তান নেয়ার পক্ষে তার অতিরিক্ত জোরজবর করার ফল এটা? হতে পারে। মা বউতে তাহলে খুব ভাব হয়েছে ? খুব ভালো।দুজন মিলে তাকে এমনভাবে জব্দ করার পায়তারায় নামল কেন?এটাই ভেবে পাচ্ছেনা। একবারো তাঁদের কেন মনে হয়নি যে তার মনে সন্দেহেরর মতো পাপ জন্ম নিতে পারে?জন্ম নেয়া সে পাপ একবার মনে স্থায়ি আসন গেড়ে নিলে, তার ফল কী পরিমাণ ভয়ঙ্কর হতে পারে, তার কোনো ধারণা আছে ওদের ? নেই।থাকলে ওরা এমনটা করতে পারতো না।
মা ফোন করেই চলেছে। ফোনের যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে ফোনটা একেবারে বন্ধ করে দেয়।মা কি মনে করবে সে ভাবনাকে উড়িয়ে দিয়ে, মনে মনে বলে-‘আমি কী মনে করব, কীভাবে নিব সেইডা কেউ ভাবছে? ভাবে নাই।আমি ভাববো কেন !

মা, ক্লিনিকের সাত নাম্বার কেবিনের সামনে পেতে রাখা চেয়ারে, বেয়ানের সঙ্গে বসে আছেন।বেয়ান, নাতি হয়েছে তাই খুব খুশি।নাতি এমন হয়ছে, তেমন হয়েছে এ সব নিয়ে আছে।বেয়ায় গেছে মিষ্টি আনতে। হাবীবের একমাত্র বোন আঁখি আসছে জামাইকে নিয়ে।একে একে সব আত্মীয়-স্বজন আসবে। বউ নাতি কে দেখতে।বউটা ঘুমিয়ে পড়েছে। এরই ফাঁকে একটু ঘুমাক। অনেক দখল গেছে মেয়েটার ওপর। সিজারিয়ান হওয়ার আশঙ্কা ছিল।শেষে নরমাল ডেলিভারি হয়েছে।খোদার দরবারে শোকরিয়া জপ করে চলেছে মা।এখনো মনে মনে তা-ই জপ করছে। ছেলেটা সংবাদটা পাওয়ার পর কিছুই বলল না।তাই দুশ্চিন্তা হচ্ছে। রাগ করেছে মনে হয়? করলে করুক। সবকিছু ওর ইচ্ছে মাফিক চলবে নাকি? না তা হবে কেন? পরিবারের সবার পছন্দ ইচ্ছা -অনিচ্ছা সব কিছুকে গুরুত্ব দিতে হবেনা?না, সে সবসময় নিজের মতকে গুরুত্ব দেবে।এ হারামজাদাটা ও একেবারে নিজের বাপের মতো হয়েছে।কাজ পাগল ছেলেটা তাঁর।কাজ নিয়েই মেতে থাকতে ভালোবাসে।কাজ নিয়ে থাকতে চাস থাক। অবসরে একটু সবার সাথে মনভরে কথা বল! তা করবে না,ওর ঘুমানো চাই। আরে বাবা ঘুমা, সেটারও তো একটা লিমিট থাকবে, থাকবে না?বউমা কে বার কয়েক জিগ্যেস করেছিল কথাটা ওর কানে দিয়েছে কিনা? মাথা নেড়ে না বলেছিল।শেষবার যখন জানতে চেয়েছে তখন সাত মাস পেরিয়ে গেছে। তখনও বলেছিল-না! মেয়েটার জেদ আছে বলতে হবে।আমি ওর বাপকে জব্দ করতে পারিনি ও আমার ছেলেকে জব্দ করতে পারবে।পারবে কী! পেরে গেছে! ছেলেটা বিদেশ গেছে পর্যন্ত নিজের বোন আঁখির কাছে যে একবার কল করেছে।সেবারই ও আকারে -ইঙ্গিতে বলেছে কথাটা। মনে হয় ও কোনো কথা নিয়ে বেশিক্ষণ পড়ে থাকেনা। সেটা যদি কাজের না হয় তাহলে তো এ কান দিয়ে ঢুকে ঐ কান দিয়ে বেরিয়ে যায় ।কাজই ওর সব। মাশাল্লাহ রোজগার ভালোই করে। রোজগার কিসের জন্যে? সংসারে সবার সুখের জন্যে তো। যে সংসারের জন্যে এতো খাটা-খাটনি সে সংসার কেমন চলছে তাঁর খবরও তো রাখতে হবে। সবকিছু মায়ের উপর ছেড়ে দিলে হয়না। মা আর কদিন।
কর্মচঞ্চল মানুষটা হঠাৎ বজ্রাহতের মতো দাঁড়িয়ে আছে দেখে, হাবীবের ঘনিষ্ঠ সহযোগী- ইকবাল বার দুয়েক ডাকে-ও ভাই।হাবীব ভাই! কী হইল ভাইয়ের? সাড়া না পেলে ও কাছে যায়।কাঁধে হাত রাখলে ওর সম্বিত ফিরে পায়। ইকবাল বলে- ‘কোনো সমস্যা হইছে ভাই?’
না, কিচ্ছু না।
কিছু একটা ভেবে বলে -‘ইকবাল চলো আমার লগে। মার্কেটে যাবো।’
“হাতে তো মেলা কাম ভাই , সব ফেইলা অহনই মার্কেট যাইবেন ?”
‘হ, চলো অহনই যাবো।একখান দরকারে যাব।কাম অরা আছে অরা করুক। সবাই কে উদ্দেশ্য বলে-হুনেন সবাই! আমরা একটু বাইরে যাইতেছি, আপনারা মন দিয়া কাম করেন। কোনো ভুল-ভাল না হয় মতন করবেন অ্যাঁ, আসতাছি !
সবার দৃষ্টি আকর্ষণ সম্ভব হয়েছে।সবাই মন দিয়ে কথাটা শুনেছে বলে মনে হলে ওরা বের হয়।পার্কিংয়ে রাখা নিজের কার স্টার্ট দিয়েই পাশে বসা ইকবালকে কৌতূহল মেটাতেই বলে যেন -‘ হুনেন ভাই,আফনে তো মেলা দিন থিকা ইসমার্ট ফোন ব্যবহার করতেছেন। আইজ আমিও একখান- না, দুইখান কিনবো। ভিডিও কল, ফেইসবুক আরও কী সব করেন না আফনেরা দুইটাতে সব ঠিকটাক কইরা দিবেন।
পাইবেন তো?’
‘হ ভাই,পারব’
হাবীবের মুখে এ সময়ে এমন কথা শুনে ইকবাল একটু অবাক হয়।কাজ পাগল মানুষের মুখে এমন অকাজের

কথা শুনে তাকে তো একটু অবাক হতেই হয়।ও আর কিছু বলেনা। মুখের দিকে তাকিয়ে,ভাইয়ের মনের অবস্থা বুঝে নিতে চায়।বসে বসে ভাবে চুপচাপ। কিছু একটা তো হয়েছেই।কী এমন হলো? ভেবে পায় না।
চায়নীজদের “ড্রাগন মার্ট”মার্কেটে গাড়ি পার্ক করে, বড় একটা মোবাইল সপে ঢুকে। এটা -ওটা দেখার পর, অনেক দামি দুইটা মোবাইল কিনে ইকবালের হাতে দিয়ে বলে -‘ভাই অহনি ঠিকটাক কইরা দেও।’
‘হ ভাই দিতাছি’
‘ভালো মতন কইরো যাতে পরে কোনো সমইস্যা না অয়’
ইকবাল হেসেই বলে -‘না ভাই,কোনো সমইস্যা অইব না’
ইকবাল তাজ্জব হয়ে যায় ! ভাইয়ের কান্ড দেখে।যে মানুষটা খুব সস্তা কোনো মতে কথা বলার কাজ সারতে মোবাইল ব্যবহার করতো, সে কিনা সবার থেকে দামি মোবাইল কিনলো! কি হয়েছে তা জানতে মন কৌতূহলী হয়ে ওঠে।
ক্লিনেকে এসে ভাইয়ের ছেলেকে দেখে -আঁখি তো ভীষণ খুশি ! কোলে নিয়ে অনেক আদর করে।শুইয়ে রেখে, অনেক কথা বলে।বলে-,’তুই তোর বাপের মতন হইস না বাপ। তোর এই আন্টির মতো হইবি কেমন, হারাদিন আমার লগে বকরবকর-বকরবকর করবি।করইবি তো?
কথা শেষে করে ছবি তোলে। অনেক-অনেক ছবি তোলে।
এতক্ষণ ওর কান্ড -কারখানা দেখে সবাই হাসছিল। হাসছিল-সোহাগা ।ওর এমন করে ছবি তোলায় মা একটু বিরক্ত হয়েই বলে- ‘আহ্ ! এত্ত ছবি তোলছ কেন অ্যাঁ! কি অইব অত ছবি দিয়া? ‘
‘মা,আমার ভাতিজারে বিয়া দেওনের সময়।
পাত্রী পক্ষরে ছবি দেওন লাগবো না? তা-ই ছবি তুলতেছি।’
বলেই ও হিহি করে হাসে। হাসে সবাই।
মেয়ের বাঁদরামি অসহ্য লাগতেই ও কে ঠেলে কেবিনের বাইরে পাঠিয়ে দেয়।
ইকবালে তার মোবাইলটি সেটিং করে দিতে না দিতেই দেখে imo তে একটা ছবি পাঠিয়ে দিয়েছে আঁখি। ছবিটা ওরই হবে।ছবি তোলতে ও ওস্তাদ।মুখ বাঁকিয়ে, কত কী ঢঙয়ে ছবি তোলে নিজ নিজে। ও রকম ছবি মোটেও তার পছন্দ না।
কাজেই তা দেখে কাজ নেই, শুধু শুধু কিছু টাকা জলে ফেলার কোনো মানে হয়? এড়িয়ে যেতে গিয়েই ওর অনভ্যস্ত হাত খুলে ফেলে আঁখির কন্টাক্ট লাইন।খুলেই ও তো অবাক !
ওমা! এ-তো স্বপ্ন দেখা সোহাগার কোলের সেই বাচ্চাটা! তাহলে স্বপ্নটা সত্যি ছিল? বাকিটা তার উপরে জমা সোহাগর অভিমান।তা-ই হবে।
ভিডিও কল দেয়।ভাইয়ের কলে ঝড়ের বেগে কেবিনে প্রবেশ করে আঁখি।মায়ের রাগান্বিত মুখের সামনে যখন হাবীবের হাসিমাখা মুখটি ধরে।তখন মায়ের চেয়ে খুশি আর কাউকে দেখা যায় না।মা কথা বলে । নাতিকে দেখায়,বলে-‘দেখ বাপ, তোর ছেইলেরে মন ভরে দেখ।’
ভিডিও তে দেখা মাত্র তার মনের দেয়ালে আবারো একটি
সন্দেহের কাক এসে বসে কা কা কা,,,!রব করা আরাম্ভ করে দেয়।সে আর নিজের সন্তানের দিকে তাকাতে পারেনা। সোহাগাকেকে দিতে বললে মা দেয়। সোহাগাকে দেখেই বুকের ভেতরে হুহু করে ওঠে।কান্না শুরু হয়। একি হাল হয়েছে তাঁর পরীর !
শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে শরীর।চোখের নিচে জমেছে কালি। মায়াবী মুখের সেই লাবণ্যে আর স্নিগ্ধতা নেই, কোথায় যেন উধাও হয়ে গেছে সব। একটা বছর না ঘুরতেই সব শেষ। আহা ! দুই চোখ পানিতে ভরে ওঠে তার।মুখ আড়াল করে চোখ মুছে নেয়।এ জন্যেই সে এখনি বাচ্চা নিতে বাধ সেধেছিল।যা ভয় ছিল তাই হয়ে গেল। সোহাগা ভাবছে- ব্যাপারটা কি? মানুষটা অযথা কাঁদছে কেন?কান্নাকাটি করার মতো কিছু তো ঘটেনি ও তাই বলে-‘কাঁদতেছেন কী জন্যি অ্যাঁ ?’
হাবীব মুখে মলীন হাসি ফোটে।
‘কাঁদতেছি কই,না, কাঁদবো কেন?’
‘আইজ তো আপনার খুশির দিন।মাগনা একটা ছেইলে পাইছেন।মাগনা ছেইলে পাইলে কেউ যে কাঁদে এইটা আমি আগে কোনোদিন দেহিনাই। আইজ পরথম দেইখলাম।’
বলেই মুখ টিপে হাসে।
কথাটা কানে যাওয়া মাত্র, তাঁর মনের দেয়ালে এবার অনেক সন্দেহেরর কাক, কা কা কা রব করা শুরু করে দেয়।আশ্চর্য হয়ে সে খেয়াল করে দেখে তার মনে কাকগুলোর রঙ পরিবর্তিত হয়ে শাদা হয়ে গেছে।আচ্ছা কাক কি শাদা হয়? হয় না। তবে এগুলো শাদা হয়ে যাওয়ার কারণ কি? সে ভাবনাকে দূরে সরিয়ে সে “মাগনা” শব্দটার মানে জানতে অধীর হয়ে ওঠে।
‘মাগনা ছেইলে পাইছি মানে কি বুঝাইতে চাইলো রূপা?ও কি তাইলে সত্যই পাপী? না, তা হইবো কেন। পাপী কি কহনো পাপ স্বীকার করে? না করেনা।
‘আইচ্ছা তুমি মাগনা ছেইলে পাইছি মানে কি বুঝাইলা?
‘মাগনা না -আফনের একটা সন্তান দুনিয়ায় আসতেছে এইটা নিয়া কোনো টেনশন কইরতে হইছে? হয়নাই।’
সন্তানের জন্যি অহন পইর্যন্ত কোনো বাড়তি খরচা কইরছেন? করেন নাই।’
হাবীব কিছু বলতে যাচ্ছিল,রূপা তাঁকে হেসেই ঠোঁটে আঙ্গুল চেপে থামায়।
‘কারো বউয়ের সন্তান হওনের কথা জানাজানি হইলে সে কত্তরহমের স্বপন দেহা শুরু করে। আফনে তো কিচ্ছুই কইরলেন না!করছেন? করেন নাই। তাইলে তো মাগনাই
কইতে অয় না?
‘তোমার কথাটা পুরাপুরি ঠিক না।অনেক ভুল আছে।ভুল ধইরা দিয়া কথা বলতে পারতেছিনা। ঐখানে আম্মা আছে বইন -আঁখি আছে, আঁখি তো একটা বড় ফাজিল ।অর মোবাইলে কথা বলতেছি না।পরে দেখবা আমাগো সব কথা রেকডিং কইরা রাখছে।বিপদে পইড়া যাব।অরা কাছেপিঠে আছে? নাই না?’
সোহাগা ঘুমন্ত ছেলের গায়ে কাঁথা টেনে দিয়েই জবাব দেয়-‘নাই।’
পুরোটা কেবিন হাত ঘুরিয়ে দেখায়। কেউ নেই দেখে সোহাগাকে ডাকে -‘এই হুন !
ডাক শুনে সোহাগা আবার হাবীবের মুখের দিকে তাকায়।তাকিয়ে থাকে। বুকের ভেতরটা এখন বেশ হালকা বোধ করছে হচ্ছে তার।এতদিন একটা জগদ্দল পাথরে নিচে চাপা পড়েছিল যেন।বাইরে থেকে মানুষটাকে যতোটা কঠিন আর স্বেচ্ছাচারী মনে হয়েছিল আসলে ভেতরে-ভেতরে সে কতোটা নরম স্বভাবেরর। তা আজই বুঝতে পেরেছে। ওর ভুলটা ভেঙ্গেছে।আজ খুব মায়া হচ্ছে তার। সত্যি মানুষটাকে সে ঠকিয়েছে।অনেক ঠকিয়েছে।এমন একটা তাড়না তার ভেতরে ঘুরপাক খাচ্ছে এমন সময় হাবীব বলে -হুন এই নাও -ওওম্মা!
একটা ফ্লাইং কিস দেয়।লজ্জায় লাল হয়ে যায় সোহাগার মুখ।
‘এই নাও আরেকটা -ওওম্মা! এইটা আমার খোকনের জন্যি।অরে দিয়া দেও।’
‘পরে দিবো অহন দিয়া যাইবো না। ঘুমাইতেছে দেহো। অহন দিলে ও বুঝতেই পারবো না যে অর বাপে অরে আদর দিছে।’
‘আইচ্ছা পরে দিও।’ দেহো এইটা কী?
সোহাগা দেখে একটা প্যাকেট

প্যাকেটের গায়ে মোবাইলের ছবি দেখা যায়। ছবি দেখে সহজে অনুমান করে ভেতরে তাই থাকতে পারে।বলে-‘মোবাইল না?’
‘হুম-মোবাইল। এইটা তোমার জন্যি আর যেটা দিয়া কথা বলতেছি এইটা আমার। অনেক দাম দিয়া কিনছি।অহন ডেইলি একঘন্টা কথা বলব তোমাগো লগে।’
‘সত্য ?
‘সত্য-সত্য ! টাকার পিছে অনেক দৌড়াইছি। অহনো দৌড়াব।দৌড়াতেই অইবো।তয় পাগলের মতন না। তোমারে বিয়া কইরা আননের পর মাথায় চিন্তা আসল, আরে ঘরে নতুন মানুষ আসছে ইনকাম তো বাড়েনাই? খরচ বাড়লে ইনকামও বাড়াইতে অয়।অহন চিন্তা করি আমার এত উন্নতি কার জন্যি সম্ভব অইতেছে। আমার ছেইলের জন্যি।সে সংসারে আইতে না আইতে আমার উন্নতি হওন লাগছে। একটার পর একটা কাজ পাইতেছি। ‘
‘সত্য ! ‘
‘হুম, আইজ আরেকটা কাজ নিতে যাবো। ইনশাল্লাহ কাজটা পাইয়া যাবো।টাকার চিন্তায়
দেশের বেকার সময়টা ভালো মতন কাটাইতে পারিনাই। কাজের জন্যে কতো জায়গায় ঘুরছি।মনের মতো কাজ পাইনাই।তোমার লগে আন্তরিকতা, ভাব ভালোবাসা ঠিকটাক মতন অয়নাই। উল্টা খারাপ ব্যবহার করছি। আমারে তুমি মাফ কইরা দিও!’
কথাটা কানে যাওয়া মাত্র সোহাগা কেঁপে ওঠে যেন বলে-
‘ছিঃ ছিঃ আফনে মাফ চাইতেছেন কেন? চাইবো তো আমি।আফনে আমার স্বামি, আমি আফেনের কথা হুনিনাই।মায়ের কথা হুনছি। আফনের কথা রাখনটা ফরজ আছিল।আমি আফনারে ঠকাইছি।আমারে আফনে মাফ কইরা দেন। হাবিব আর কিছু বলতে পারেনা
কেঁদে ফেলে। সোহাগা ও সুখে কাঁদছে। কোনো পুরুষ মানুষকে এমন করে কাঁদতে দেখেনি সে কখনো।আজ দেখেছে।দেখে বুঝছে সব পুরুষ মানুষ ভেতরে -বাইরে এক না।

উত্তর দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here