কাজ : আমার পরিচয় * লেখক-অকাপা

0
109

জগত জুড়িয়া আছে এক সুবিস্তৃত সুবিশাল জাল,
এই জালের নেই কোন সসীম জলমহাল।
যেথায় যাইবে মানুষ, ইহা সদা তোমার পিছু পিছু,
নিরন্তর ছুটিবে পিছু, তুমি, করিতে পারিবেনা কিছু।
এই জালের নাম শুধু “কাজ আর কাজ”
ইহার স্রষ্টার নাম চির অদৃশ্য বিধাতা মহারাজ।
অমর, অক্ষয়, অজর, তিনি সর্বব্যাপী পরাক্রমশালী,
সর্বভূতে বিরাজমান এখনো, অতীতের মগদ, বৈশালী।
আছেন, থাকিবেন, তিনি, সদা চিরঞ্জীব,
বিশ্বমধ্যে বিরাজমান যতসব জীব, নির্জীব,
সবই হইবে লয়, শুধু তিনি একা, একা,
থাকিবেন, রাখিবেন, সদা তার অম্লান, চলিষ্ণুতা।
কিন্তু তার পরেও কাজের, মৃত্যু নাহি হবে,
বিধাতার ওই রহস্যপূর্ণ সহস্রকোটি ভবে।
বিধাতা অত্যন্ত জটিল, কঠিন, দুর্বোধ্য এক সত্ত্বা,
প্রলয়ঙ্করী তান্ডব-নৃত্য প্রকাশে, তার উদ্যম মত্ততা।
কখনো গরম, কখনো নরম, কখনো দয়ার সাগর,
তার মেজাজ-মর্জি বোঝা দুষ্কর সারাটি জীবনভর।
কোথায় থাকেন, কীভাবে থাকেন, জানেনা মানুষ কিছু,
তাইতো মানুষ সারাটা জীবন ছুটিছে তাঁর পিছু পিছু।
মসজিদে যায়, মন্দিরে যায়, যায় প্যাগোডায়, গীর্জায়,
কোথাও চাক্ষুষ দর্শন না মিলে, মিলেনা শিনাগগ্ গুরদুয়ারায়।
একাই সে পূজার্চনা করে, ভেসে যায় চোখের জলে,
এজগতে নগদ নাহি পায় কিছু, পাবে নাকি মরণের পরে।

আজীবনভর শুধু পূজার্চনা করেও, আনিতে পারিলামনা একটি ভাত,
অমানুষিক জঠর-যন্ত্রণায় কাতরালাম, সারাটি জীবন দিন-রাত।
পাড়া-পড়শি কেউ যদি কখনো দয়াপরবশ হইয়া,
বেঁচে থাকি আধপেটা হয়ে সেই ভাত খাইয়া।
এভাবে অসহ্য ক্ষুৎপিপাসায় অমানুষিক কষ্ট পাইয়া,
পূজার্চনার শক্তিটুকুও শেষে, ফেলিলাম হারাইয়া।
তবুও একমুঠো ভাত আসিলনা বিধাতার দরবার হতে,
অজ্ঞান হইয়া পড়িয়া রহিলাম আমার কুঁড়েঘরের মেঝেতে।

হেনকালে এলো এক কুক্কুটী-মাতা,
সাথে নিয়ে এসেছে তাঁর ছানা সাতটা।
কক্ কক্, চিয়ক্ চিয়ক্, ডাকে মুখর,
কেটে গেলো আমার অজ্ঞানতার ঘোর।
আমার আঙিনায় ছিল ক্ষুদ্র, মিষ্টি আলুর ক্ষেত।
বাচ্চাসহ কুক্কুটী সেথায় বাঁধিয়েছে কুরুকক্ষেত।
ভুজঙ্গ এক, কোথা হতে, আবির্ভূত হয়ে,
সাবাড় করেছে একটি শাবক, দ্রুত গতিতে খেয়ে।
দেখতে পেয়ে মুরগীমাতা তাঁর পায়ের নখর, ঠোঁটে
ঝাঁপিয়ে পড়লো সাপের উপর, সর্বশক্তি নিয়ে।
উলম্ফনে উড়ে উড়ে ঠোঁট আর নখর দিয়ে,
জখম করিল ভুজঙ্গকে, সর্বাঙ্গ ঘিরে।
ছোবল মারতে উদ্যত কেউটে কুক্কুটীকে, বধিতে,
ঠোকর মারিল অসংখ্যবার কুক্কুটীর ঠ্যাং, ঠোঁটে, পিঠে।
অবশেষে মহিষমর্দিনী কুক্কুটীর ক্ষিপ্ত গতির কাছে,
হার মেনে পালিয়ে গেল, বিষাক্ত ভুজঙ্গ-কেউটে।
আরেকটি ছানাকে নিয়ে দৌঁড়ে ঢুকিল ওর গর্তে।
“কক্ কক্ ককক্” করতে করতে কুক্কুটী রয়ে গেল মর্ত্যে।

সর্প-কুক্কুটীর অসম লড়াই, করিল মোরে বুদ্ধিমান,
মিষ্টি আলু খাইয়া সেই রাতটি কোনমতে কাটাইলাম।
মুরগিমাতার আগমন মোর আঙ্গিনার উপর।
খুলিয়া দিল বুদ্ধির জড়তা, কূপমন্ডূকতা মোর,
ছানাগুলোকে খাওয়ানোর নিমিত্তে, ওর আগমন আলুক্ষেতে মোর,
কূপমন্ডূকতার লৌহকপাটের খুলিয়া দিল দোর।
মুরগিমাতা ধূলাবালির মধ্যে আঁচর কেটে কেটে,
ছোট ছোট ছানাদের জন্য অবিরত, খাদ্য কণিকা খোঁজে।

পরদিন প্রত্যুষে আমার জালটি হাতে নিয়ে,
চলে গেলাম সোজা মোদের “সন্দীপনী বিলে”।
মাছ ধরিলাম দু’ঘণ্টা যাবত ওই জলাভূমি খালিজুলিতে,
ভরে গেল খালুইটি মোর দ্রুত গতিতে।
পাশের বাড়ীর ধনী কৃষক এলাহিবক্স হাওলাদার,
যাচিতে গেলাম তাঁর কাছে এক কেজি চাল ধার।
খালুইটি দেখে তিনি বললেন, “ওটার মধ্যে কী?”
বলিলাম, ধরেছি মাছ অনেকগুলো শ্রদ্ধেয় তালুইজি।
যারপরনাই খুশি হলেন তরতাজা মাছ দেখে,
ক্ষুৎজ্বালা হতে তৎক্ষণাৎ, মুক্তি দিলেন মোকে।
রেখে দিলেন উচিত দামে, মাছগুলো খালুইর,
দ্রুতপদে হেঁটে গেলাম কাছের “হাঁট-তালুইর”।
হলুদ, মরিচ, রঁসুন, পিঁয়াজ, লবণ, আরো তেল,
কিনে আনলাম অনেক কিছু, আরো মস্ত একটি বেল।

বাজার থেকে এনেছিলাম শলাচিংড়ি মাছ।
শলাচিংড়ির বড়ায় খেলাম সকালবেলার ভাত।
বহুদিন যাবত পেটে পড়েনি পূর্ণ-উদর খানা,
আজি হেরি হায়, সেতো মোর, কর্মের লিখন ছিল না।
বিধাতা দিয়েছেন কর্ম-,কর্ম-, শুধুই কর্ম,
মানুষ সৃষ্টি করেছে বিধাতার, উপাসনার জন্য ধর্ম।
ভেবেছিলাম আসিবে তাতেই অন্ন, বস্ত্র, চিকিৎসা,
কিন্তু হেরি হায়, আসিল না কিছুই, আসিল, অভাবের অমানিশা।
রীতিমতো ধর্মোপাসনা, পূজার্চনা, আরাধনা করে,
আসিল না কোন অন্ন, বস্ত্র বিধাতার তরফ হতে।
কিন্তু মুরগীমাতার শিক্ষা হতে, যবে কর্ম ধরিলাম
জীবনোপচারসব মেলার মাধ্যমে, বিধাতার উত্তর পাইলাম।

সেই হতে আমি হলাম কর্মনিষ্ঠার কাজি
কর্ম পেলে কর্ম করি, কর্মেই ডুবে থাকি।
তাইতো আমায় সবাই ডাকে “করণ-কারক” বলে,
আমি বিনে সব আশা যে, ভেস্তে যাবে জলে।
প্রতিদিনই মাছ ধরি আর বেচি “তালুইর হাটে”
জীবন চলে এখন আমার জালজীবী হয়ে।
(ক্রমশঃ)

উত্তর দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here