অনুগল্প

0
58

হলদি আগুন
কামাল হোসেন রাতুল

শীতের দিন।বেশ রৌদ্রকরোজ্জ্বল একটা দিন।
শীতে এমন দিন খুব একটা হয় না।আজ হয়েছে।কেন হয়েছে কে জানে।চারদিকে অঢেল সর্ষেক্ষেতের মাঝখানে একটি মাঝারি সাইজের ব্রিকসলিনের রাস্তা নন্দপুর গ্রামের হাট হয়ে চলে গেছে আমানের শশুড়বাড়ির পাশ দিয়ে। এই পথ কোথায় গিয়ে শেষ হয়েছে কে জানে। আমানের তা জানা হয়নি। আজ মনে হচ্ছে না জেনে রেখে ও ভুলই করেছে।আবার ভাবে ও -মানুষ কতটুকুই বা জানে।কতটুকুই বা জানতে পারে।রোজ কত ঘটনা ঘটে। কত সমস্যা তৈরি হয়।ঘটে যাওয়া ঘটনায় মূল অপরাধী কে? সমস্যা তৈরির পেছেনে কার হাত রয়েছে, তা অনেকেরই জানা হয়না এই যেমন তার স্ত্রী রূপা,ঘরের মানষটাকে নিয়ে ঘটে যাওয়া ঘটনার কোনো কূল কিনারা করতে পারেনি ও। কূল কিনারা করা তো উচিত।নইলে যে সন্দেহের কাঁটা তার বুকটা ক্ষত-বিক্ষত করে যাবে প্রতিনিয়ত।
জীবিকার তাগিদে ভিনদেশে থাকতে হয় ওকে, বছরের পর বছর থাকতে হয়।সবকিছু শুনেও সাথে সাথে ছুটে আসতে পারেনি, সময় লেগেছে। অনেকদিনই লেগেছে।ততদিনে অনেককিছু ঢাকা পড়ে গেছে হয়তো, নইলে ও ঘটনার তল পাবেনা কেন।মা অবশ্য খুব বেশি রাখঢাক জানেনা মায়ের কথায় আস্থা রাখলে সন্দের তীর ছোটে ভাই রোমানের দিকেই যায়।না, ভাই এমটা করতে পারেনা।সে তাকে কত ভক্তি,শ্রদ্ধা করে।তার একমাত্র সহজ-সরল ছোট ভাইটির মুখে সে কিছুই খুঁজে পায় না। অনেক ভেবেছে,অনেক ঘেটেছেও।মা,তার ভার মুখটা দেখামাত্র রূপার বদনাম করে যাচ্ছে,করেই যাচ্ছে।আদেশ করছে-‘ঐ নষ্টা মেয়ে মানুষটারে ছেড়ে দে বাপ, তালাক দে ! এমন মেয়ে মানুষ দিয়া আর যাই হউক, সংসার অয়না!’
কিছুতেই সে কোনো ভিত্তি খুঁজে পায় না।যার ওপর ভর করে সে একটা সিদ্ধান্ত নেবে। সিদ্ধান্তহীন অনেক দিন চলে গেল। আজ সে সবকিছু পেছনে ফেলে যাচ্ছে রূপার কাছে। তাকে তার জীবনে খুব প্রয়োজন। তার প্রয়োজনটা কে বুঝতে পারে। কেউ না।যদি সে তার হাত ধরে বাড়ি ফিরে আসতে চায়।সে নিয়ে আসবে। যে যাই বলুক।হ্যাঁ তাকে ফিরে আসতেই হবে। নইলে যে তার চলবে না।সমস্ত অস্তিত্বজুড়ে যার বসবাস তাকে ছাড়া তার চলবে কেন।
তার কেন জানি মনে হচ্ছে,রূপার মুখটা দেখলে সে সব বুঝতে পারবে।সে যদি সত্যি অপরাধী হয়ে থাকে,পাপী হয়ে থাকে সেটা তার মুখ তাকে বলে দেবে।তার সারা মুখজুড়ে একটা গভীর অনুতাপের ছায়া পড়বে। যেটা সে মুছে না দিলে যাবেনা। ভিনদেশে কত লোকের সাথে তার ওলামেলা, কার মনে কোন ঝামেলা চলে ও অনুমান করতে পারে।সবসময় সব কিছু ঠিকটাক মিলে যায় তা নয়।তবে বেশিরভাগ মিলেই যায়।
বাজার পেরিয়ে ও ঐ রাস্তায় নামতেই-তার চোখ যেন জ্বলে যায়।পোড়ে যায় যেন। চোখ খুলে ঠিকমতন তাকাতেই পারছেনা। কপালে হাত দিয়ে আস্তে আস্তে চোখ খুলে-বাপরে বাপ! মনে অয় চারদিক হলদি আগুন জ্বলতেছে।ভালা করি তাকান যায় না। এমন আগুন সইল্যে জ্বালা ধরায়। পরাণঘরে থাকা দুঃখরে দেয় বাড়াইয়া।আহারে আমার রূপা না জানি এমন কত্ত দুঃখের আগুনে পোড়তেছে।হেয় আমারে দরদি কয়,আর আমি ভুল বুইঝা একটা পাষাণেরর মতন আচরণ করছি। মায়ের কথায় বিশ্বাস কইরা এমন করনটা ঠিক অয়নাই।এইদিনের জন্যি অপেক্ষা করনের দরকার আছিল।
তার চোখ দুটো পানিতে ভরে যায় । ভেজা চোখ, গলায় ঝুলানো মাফলার দিয়ে মুছে নিয়ে।আবারো সে হাঁটে। মনে মনে কথা বলে -কত্তদিন কথা অয়না আমার সোয়াচান পাখিটার লগে।কত্তদিন তার সোনামুখখানা দেহিনা।আইজ দেহুম তো?তার দুইখান কথা হুনুম তো? হে আমার সামনে আইব?নাকি কেউ-ই তারে আমার সামনেই আইতে দিবো না?
কথাটা মনে হতেই ও থমকে দাঁড়ায়।ট্রাউজারের পকেট থেকে সেলফোন বের করে।সেলফোনে রূপাদের পাশের বাড়ির একটা ছেলে, সম্পর্কে তার শালা হয়। কি যেন নাম -হুম্ মনে পড়ছে “সাদি” ওরে ফোন দিয়া বুইঝা নেয়া যায় ঐহানের পরিস্থিতি,রূপা, তার ঘরে জানালার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে নীরবে কাঁদছে। কাঁদবে না কেন।এমনিতে তার মনে কষ্টের সীমা নেই।তার ওপর তিন চারদিন ধরে তাকে নিয়ে বাড়িতে যা চলছে। কোথাকার এক ঘটক তার জন্যে পাত্রের সন্ধান এনেছে। তার হাতে তাকে তুলে দিতে উঠেপড়ে লেগেছে বড়দা ।সবাইকে রাজি করাতে -ছেলে এমন, ছেল তেমন, প্রশংসাবাণে কাহিল করে ছাড়ছে তার ক্ষেপাটে বড়দাটা।বুক চিতিয়ে বলেছে- তারা ভাবছে, ঐ বান্দির জিয়ে ভাবছে, আমার এই পবিত্র বইনের কপালে কলঙ্কের তিলক পড়াইয়া গাঙ্গে ভাসাইয়া দিবো। না আমার বইন ফেলনা না!জগতের বেবাক মানুষ জানে আমার বইন কেমন।ওরা জানেনা, ওরা চেনেনাই আমার বইনরে।চিনবো কেমনে চিনতে চক্ষু লাগে,একটা সুন্দর মন লাগে।ওসব তো অগো নাই! ভুল কইরা আন্ধা-কানার লগে কুটুম পাতছি।এই ভুল আর না।
মিথ্যে অপবাদের মুখে রূপাকে তার শশুড়বাড়ি ফিরিয়ে আনার সময়, শাশুড়ির বিষাক্ত কথার ছোবল সহ্য করতে না পেরে কী করবে না করবে দিশেহারা হয়ে গিয়েছিল প্রায় এ বড়দা।তবুও শালীনতা বজায় রেখেই কথার জবাব দিয়েছে, বোনের শাশুড়িকে, কারণ পরে যদি আবার এ মুখো হতে হয়, যাতে সম্মানটা থাকে। কিন্তু তার শাশুড়িটা যা ইচ্ছে তাই বলে গেল।
রাগে ক্ষোভে গর্জাতে গর্জাতে বড়দা বাড়িতে রূপাকে নিয়ে বাড়ি ফিরেছিল।ফিরে মাকে সব খুলে বলার সময়, নিজেকে সামলাতে না পেরে মাথাঘুরে প্রায় ফ্লোরে পড়ে যাচ্ছিল।ভাবি পেছনে দাঁড়ানো ছিল, সে ছট করে ধরে ফেলল বলে রক্ষা,নইলে অনেক বড় ক্ষতি হয়ে যেত।সেন্স ফিরে স্বাভাবিক হলে।ছুটে যায় চেয়ারম্যান মেম্বারের কাছে।নালিশ দিয়ে রাখে। সবাই জামাই বিদেশ থেকে আসা অবধি অপেক্ষা করার পরামর্শ দেয়। ঐ পরিবারের সাথে এই পরিবারের সমস্ত যোগাযোগের রাস্তা বন্ধ করে দিয়েই বড়দা এতোদিন বেশ চুপচাপ ছিল।
‘মা’ মেয়ের দুঃখে কাঁদলেও মুখে তালা দিয়ে ছিল বড়দা।কোনো সমস্যা হয়নি এতোদিন। যতো ঝামেলা বাঁধিয়েছে ঐ ঘটক।তার মুখের কথায় সে সরব হয়ে ওঠেছে।তালাকনামা রেডি করে আনার জন্যে লোক লাগিয়ে দিয়েছে আজ।কী করবে কিছুই ভেবে পাচ্ছেনা।কী করে এ বিপদ ঠেকাবে?কোনো উপায় না পেয়ে ও কাঁদছে।টানা দুই বছরের সংসারের ছোটো ছোট সুখের ছবি তার চোখের সামনে ভাসছে। তিন বছরের মাথায় আমান বিদেশ গেল। তারপর থেকেই দুঃখ তার পিছু নিয়েছে।
কারো পায়ের শব্দে চমকে পেছেন ফিরে রূপা। দেখে সাদি আসছে।দ্রুত চোখ মুছে।তাকে কাছে ডাকে-কিরে দরজায় দাঁড়াই আছস কেন? কাছে আয়।কিছু বলবি?
সাদি হ্যাঁ সূচক মাথা নেড়ে সামনে আসে।সেলফোন এগিয়ে দেয়।বলে – বুবু তোমার ফোন কথা বল।
কে করছে?
চিনিনা, তোমারে চাইল তাই নিয়া আসলাম।
রূপা কানে দিয়ে হ্যালো বলতেই, তার কানে লাগে চেনা কণ্ঠস্বর।আপন এ আপন মানুষটার কণ্ঠস্বরে তার দেহমন আনন্দে নেচে ওঠে,

বসার ঘরে মা,বড়দা,ভাবি কথা বলছিল।রূপাকে নিয়েই তারা কথা বলছিল।তাদের কথার সুতা কেটে দিয়ে কিশোরী বেলার আনন্দেমুখর রূপাই যেন তাদের পাশ কেটে ছুটে চলে গেল। তারা সবাই অবাক হয়ে রূপার যাওয়া দেখছে।

আমান রূপাকে ছুটে আসতে দেখে, সেও ছুটে যায়। কাছে এসে ঝাপটে ধরে বুকে।রূপার দ্রুত নিঃশ্বাস নেয়ার কারণে মুখের দিকে চেয়ে কিছু বলতে চাইছে, কিন্তু বলতে পারছে না। মুখ দিয়ে কথা ফুটছে না। তাকে স্থির করে আমানই বলে- রূপা আমি জহরী না হইতে পারি,তবু আমি আমার এই প্রাণমণিটারে, আমার কলিজার ভিত্রে যত্তনে থাকা মুক্তাটারে চিনতে ভুল করি নাই।
তুমি আমার খাঁটি মণিমুক্তা।তোমারে আমার বুকে ফেরত পাইয়া কী যে শান্তি লাগতেছে।বুঝাইয়া কইতে পারবো না। তোমারে হারাইয়া ফেলার ডরে আমি যে কত্ত রাইত না ঘুমাইয়া কাটাইছি।
মায়ের কথায় ভুল বুইঝা তোমারে তোমাগো পরিবারের সবাইরে অনেক কষ্ট দিছি।আমারে মাফ করো রূপা!আমারে ক্ষমা করো তুমি।রূপা আমানের মুখ চেপে ধরতে যাচ্ছিল।তখনি বড়দা এসে রূপাকে এক ঝটকায় আমানের বুক থেকে ছাড়িয়ে নেয়।রাগে গর্জাতে গর্জাতেই বলে- মাফ নাই কোনো ক্ষমা নাই তোমাগো! যাও তুমি!আমাগো ত্রিসীমানায় আসবা না! তোমার লগে কোর্টে দেখা অইবো ! এর বাইরে তোমারে আমি আর কোত্থাও দেখতে চাইনা।
রূপাকে জোড় করে টেনে নিয়ে যাচ্ছে বাড়িতে।আমান অসহায়ের মতো তা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে।

উত্তর দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here